ঢাকা | ১২ মাঘ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

চার হাসপাতাল ঘুরেও চিকিৎসা পেল না শিশু আফিয়া, ঠাঁই হলো কবরে

Modern Television
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 10, 2026 ইং
ছবির ক্যাপশন: সংগৃহীত ছবির ক্যাপশন: সংগৃহীত
ad728
হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার আশায় ঢাকায় নেওয়া হয়েছিল ছয় মাস বয়সী শিশু আফিয়াকে। কিন্তু ঢাকার চারটি হাসপাতাল ঘুরেও পিআইসিইউতে শয্যা না পাওয়ায় চিকিৎসা না নিয়েই তাকে ফিরিয়ে নিতে হয় ফরিদপুরে। পরে আবার ঢাকায় নেওয়া হলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

আফিয়ার বাড়ি ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলায়। তার বাবা মিঠুন শেখ ঢাকার একটি কার্টন ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন এবং মা গৃহিণী। দুই সন্তান নিয়ে তাদের ছোট সংসার।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৩ জুলাই আফিয়াকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত শুক্রবার (৭ আগস্ট) রাতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা তাকে ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেন।

সেই রাতেই আফিয়াকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয় পরিবার। রাত ১২টার দিকে প্রথমে তাকে আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তৃপক্ষ জানায়, পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (পিআইসিইউ)-এ কোনো শয্যা খালি নেই।

এরপর আফিয়াকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেও পিআইসিইউতে শয্যা খালি না থাকায় ভর্তি করা সম্ভব হয়নি বলে পরিবারের দাবি। আফিয়ার বাবা জানান, তারা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে একটি শয্যার ব্যবস্থা করে অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। তবে এক কর্মকর্তা তাদের তা দিতে অস্বীকৃতি জানান বলে দাবি করেন তিনি। ওই কর্মকর্তার নাম জানাতে পারেননি মিঠুন শেখ।

ঢামেকে ভর্তি করাতে না পেরে পরিবার আফিয়াকে মগবাজারের আদ্-দীন হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানেও পিআইসিইউতে শয্যা খালি ছিল না। পাশাপাশি আইসোলেশন সুবিধা না থাকায় হামের রোগী ভর্তি নেওয়া সম্ভব নয় বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়।

এরপর শেষ আশায় মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নেওয়া হয় আফিয়াকে। কিন্তু সেখানেও চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়নি বলে জানান তার বাবা।

ঢাকার কোনো হাসপাতালেই চিকিৎসার ব্যবস্থা না হওয়ায় আফিয়াকে আবার ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। সেখানে দুই দিন চিকিৎসা নেওয়ার পর রবিবার (৯ আগস্ট) রাতে তার অবস্থার আরও অবনতি হয়। ওই রাতেই তাকে আবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসে পরিবার। তবে এবার আর চিকিৎসার সুযোগ হয়নি। কর্তব্যরত চিকিৎসক আফিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন।

আফিয়ার মৃত্যুর পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেই বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন তার বাবা মিঠুন শেখ। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, ‘আজকে টাকার জন্য আমার মেয়েকে বাঁচাতে পারলাম না।’

মিঠুন শেখ বলেন, বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে এক দিনেই ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। এমন পরিস্থিতিতে অনেক পরিবারকে প্রতিদিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়—চিকিৎসা করাবে, নাকি সংসার চালাবে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামের রোগীর তুলনায় তাদের শয্যা সংখ্যা অনেক কম। হাম রোগীদের জন্য হাসপাতালে প্রায় ৩২টি ডেডিকেটেড শয্যা রয়েছে।

ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, হামের জন্য তাদের মাত্র ৩২টির মতো ডেডিকেটেড শয্যা রয়েছে। এরপরও তারা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে সংকটময় অবস্থায় রোগী নিয়ে এসে ভর্তি করানোর অনুরোধ করা হলে শয্যা সংকটের কারণে তা সব সময় সম্ভব হয় না।

আফিয়ার পরিবার তাকে অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়নি বলে যে অভিযোগ করেছে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে ঢামেক পরিচালক বলেন, নির্দিষ্ট রোগীটির বিষয়ে তিনি জানেন না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন এবং এমনটা হওয়ার কথা নয় বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম আফিয়ার বিষয়ে বলেন, তাদের হাসপাতালে ৭০০ শয্যার মধ্যে ১০০টি আইসিইউ রয়েছে এবং এসব শয্যা সব সময় পূর্ণ থাকে। সারা দেশ থেকে রোগী আসায় বর্তমানে ভর্তি থাকা রোগীদের সরিয়ে নতুন রোগী ভর্তি করা সম্ভব নয়।

হাসপাতাল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শয্যা সংরক্ষণ করে রাখার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এমন অভিযোগের প্রশ্নই ওঠে না। লিখিত অভিযোগ পেলে তিনি তদন্ত করবেন। একই সঙ্গে হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের প্রায় দুই হাজার শয্যা প্রয়োজন। কোনো রোগী যেন হাসপাতাল থেকে ফিরে না যায়—এটাই তাদের প্রত্যাশা।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ ও হামে আক্রান্ত হয়ে মোট ৮৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গে ৭৮০ জন এবং নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে ৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সোমবারের নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, ১৫ মার্চ থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩১২ জন। এ সময়ে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৭ হাজার ২৭৮ জন।

নিউজটি পোস্ট করেছেন : Modern Television

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ