
প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা একজন মুমিনের হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতিগুলোর একটি। তাঁকে ভালোবাসার অর্থ শুধু আবেগ প্রকাশ নয়; বরং তাঁর সুন্নাহ, আদর্শ, চরিত্র ও জীবনপদ্ধতিকে নিজের জীবনে ধারণ করা। পবিত্র কোরআনেও আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের তাঁর আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন।
আমরা সৌভাগ্যবান নই যে দুনিয়ার জীবনে প্রিয় নবীজি (সা.)-কে স্বচক্ষে দেখেছি। তবে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর বর্ণিত হাদিসের মাধ্যমে তাঁর পবিত্র অবয়ব, সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। সেই বর্ণনাগুলো পড়লে বোঝা যায়—নবীজি (সা.) ছিলেন অনন্য সৌন্দর্য ও আকর্ষণের অধিকারী।
রাবিআ ইবনে আবদুর রহমান (রহ.)-এর বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) খুব বেশি লম্বা কিংবা খুব বেশি খাটো ছিলেন না। তাঁর গায়ের রং ছিল উজ্জ্বল ও কোমল আভাযুক্ত। চুলও ছিল না অতিরিক্ত কোঁকড়ানো, আবার একেবারে সোজাও নয়। (সহিহ বুখারি: ৩৫৪৮; সহিহ মুসলিম: ২৩৪৭)
বারা ইবনুল আজিব (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মধ্যম আকৃতির এবং তাঁর দুই কাঁধের মাঝখান ছিল প্রশস্ত। তাঁর চুল কানের লতি পর্যন্ত পৌঁছাত। তাঁকে লাল ডোরাকাটা পোশাকে দেখে তিনি মন্তব্য করেন—তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চেয়ে সুন্দর আর কাউকে দেখেননি। (সহিহ বুখারি: ৩৫৫১; সহিহ মুসলিম: ২৩৩৭)
আলি (রা.)-এর বর্ণনায় তাঁর দৈহিক গঠনের আরও কিছু বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। তাঁর হাত-পায়ের তালু ও আঙুল ছিল সুগঠিত, হাড়ের জোড়গুলো ছিল দৃঢ় এবং বুক থেকে নাভি পর্যন্ত সূক্ষ্ম পশমের একটি রেখা ছিল। তাঁর চলার ভঙ্গিতেও ছিল স্বাতন্ত্র্য। (সুনানুত তিরমিজি: ৩৬৩৭)
জাবির ইবনে সামুরা (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চেহারা সম্পর্কে বলেন, তাঁর মুখমণ্ডল ছিল প্রশস্ত, চোখ ছিল বড় ও আকর্ষণীয় এবং তাঁর অবয়বে ছিল অপূর্ব ভারসাম্য। (সহিহ মুসলিম: ২৩৩৯)
তবে তাঁর সৌন্দর্যের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী বর্ণনাগুলোর একটি এসেছে জাবির ইবনে সামুরা (রা.)-এর কাছ থেকে। তিনি বলেন, একবার তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দিকে তাকালেন, আবার আকাশের চাঁদের দিকে তাকালেন। এরপর তাঁর কাছে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কেই চাঁদের চেয়ে অধিক সুন্দর মনে হলো। (সুনানুত তিরমিজি: ২৮১১)
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, তাঁর চেহারা ছিল সূর্য ও চাঁদের মতো উজ্জ্বল ও গোলাকার। সূর্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে তাঁর মুখমণ্ডলের দীপ্তির কারণে, আর চাঁদের উপমা এসেছে তাঁর কোমলতা ও লাবণ্যের প্রকাশ হিসেবে। (সহিহ মুসলিম: ২৩৪৪)
আবু হুরায়রা (রা.)-এর বর্ণনাতেও তাঁর অসাধারণ সৌন্দর্যের কথা ফুটে উঠেছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চেয়ে সুন্দর কাউকে তিনি দেখেননি। তাঁর মুখমণ্ডলের উজ্জ্বলতা যেন সূর্যের আলোকে স্মরণ করিয়ে দিত। (মুসনাদে আহমদ: ৮৬০৪)
তবে প্রিয় নবীজি (সা.)-এর সৌন্দর্য শুধু বাহ্যিক অবয়বেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর সত্যবাদিতা, দয়া, নম্রতা, ক্ষমাশীলতা, সাহস, আমানতদারি ও উত্তম চরিত্র তাঁকে মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শে পরিণত করেছে।
আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি (সা.) যখন মদিনায় আগমন করেন, তাঁকে প্রথম দেখেই তাঁর অন্তরে বিশ্বাস জন্মে যায়—এটি কোনো মিথ্যাবাদীর চেহারা হতে পারে না। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.) মানুষকে সালামের প্রচলন, খাদ্য দান এবং রাতের ইবাদতের প্রতি উৎসাহিত করেন। (সুনানুত তিরমিজি: ২৪৮৫)
তাই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সৌন্দর্য নিয়ে আলোচনা শুধু তাঁর অবয়বের প্রশংসায় সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। তাঁর প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ হলো তাঁর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা, তাঁর চরিত্র অনুসরণ করা এবং তাঁর দেখানো পথে জীবন পরিচালনা করা।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে প্রিয় নবীজি (সা.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা, তাঁর সুন্নাহ অনুসরণের তাওফিক এবং তাঁর আদর্শে জীবন গড়ার সামর্থ্য দান করুন। আমিন।